ইরানের ওপর মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর ব্যাপক বিমান হামলার প্রথম দিনেই দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হয়েছেন, ঘোষণা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পরবর্তীতে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনও এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
খামেনি ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ইরান শাসন করা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা। ইরানের শাসন ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ নেতা পদটি সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, যেখানে তিনি রাষ্ট্রপ্রধান এবং অভিজাত বিপ্লবী গার্ডসহ (আইআরজিসি) দেশের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন।
শৈশব ও রাজনৈতিক উত্থান
আলি খামেনি ১৯৩৯ সালে উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন আট ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয়। তাঁর বাবা একজন মাঝারি সারির শিয়া ধর্মগুরু। খামেনি প্রায়ই তাঁর ‘দরিদ্র কিন্তু ধার্মিক’ শৈশবের কথা স্মরণ করতেন, যেখানে খাবারের তালিকায় প্রায়ই শুধু রুটি ও কিশমিশ জুটত। ১১ বছর বয়সে তিনি ধর্মগুরু হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন।
খামেনি তৎকালীন শাহ’র সমালোচকদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এ কারণে তাকে বহু বছর আত্মগোপনে থাকতে হয়েছে এবং ছয়বার গ্রেপ্তার ও কারাবরণসহ নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর, রুহুল্লাহ খোমেনি তাঁকে তেহরানের জুমার নামাজের ইমাম নিযুক্ত করেন, যা তাঁকে দেশের নতুন নেতৃত্বের অন্যতম মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
মার্কিন বিরোধিতা ও ক্ষমতার সিঁড়ি
বিপ্লবের পর মার্কিন দূতাবাস জিম্মি সংকটের সময় খামেনি উগ্রপন্থী ছাত্রদের সমর্থন দেন। ৪৪৪ দিনের সেই জিম্মি দশা ইরান-আমেরিকার সম্পর্ককে চিরস্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ১৯৮১ সালে এক হত্যাচেষ্টায় তিনি গুরুতর আহত হন, এবং ডান হাত চিরতরে অচল হয়ে যায়। একই বছর প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ-আলি রাজাই নিহত হওয়ার পর খামেনি ৯৭ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
যুদ্ধকালীন নেতা ও সর্বোচ্চ ক্ষমতা
প্রেসিডেন্ট খামেনি ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় স্বয়ং সম্মুখ সমরে উপস্থিত থাকতেন। দীর্ঘ আট বছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এবং পশ্চিমাদের প্রতি অবিশ্বাস তাকে আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্কিত নেতা হিসেবে পরিচিত করে। ১৯৮৯ সালে খোমেনির মৃত্যুর পর বিশেষজ্ঞ পরিষদ তাঁকে নির্বাচিত করে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে। তিনি সংসদ, বিচার বিভাগ, পুলিশ ও বিপ্লবী গার্ডে অনুগতদের শক্তিশালী বলয় গড়ে তোলেন।
অভ্যন্তরীণ শাসন ও চ্যালেঞ্জ
৩০ বছরের শাসনামলে খামেনি যেকোনো অভ্যন্তরীণ বিরোধ কঠোরভাবে দমন করেছেন।
-
১৯৯৯ সালের ছাত্র আন্দোলন
-
২০০৯ সালের নির্বাচনের পর বিক্ষোভ
-
২০১৯ সালে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদ
প্রতিটি ক্ষেত্রে ইন্টারনেট বন্ধ বা সামরিক শক্তি ব্যবহার করে বিক্ষোভ দমন করা হয়েছে। নারীদের শিক্ষার প্রসার হলেও লিঙ্গ সমতার প্রতি বিশ্বাসী ছিলেন না। হিজাব বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত নারীদের কঠোর শাস্তির আওতায় এনেছেন। ২০২২ সালে মাহসা আমিনীর মৃত্যুর পর ইরানে ব্যাপক জনরোষের মুখে কয়েকশ মানুষ নিহত হয়।
পরমাণু সংকট ও আন্তর্জাতিক প্রভাব
খামেনির শাসনামলে ইরান একঘরে রাষ্ট্রে পরিণত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ইসরায়েল ও পশ্চিমাদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব তীব্র হয়।
-
২০১৫ সালে একটি পরমাণু চুক্তি হলেও
-
২০১৮ সালে ট্রাম্প তা বাতিল করে ইরানের ওপর পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন
-
২০২০ সালে কাসেম সোলাইমানির হত্যাকাণ্ড পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে
২০২৫ সালের জুনে ইসরাইল ইরানের পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালালে ইরানও পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ধসে পড়া অর্থনীতি ও ব্যাপক জনবিক্ষোভ খামেনি কঠোরভাবে দমন করেন, কয়েক হাজার মানুষ নিহত হন।
শেষ অধ্যায় ও উত্তরাধিকার
আলি খামেনি অত্যন্ত শক্ত হাতে ইরানের ক্ষমতার লাগাম ধরে রেখেছেন। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা এবং দেশের ভবিষ্যত পরিবর্তন নিয়ে বিশ্বজুড়ে গভীর জল্পনা চলছে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা
0 মন্তব্যসমূহ